দাউদ কররানির মৃত্যুদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গে বাংলায় সুলতানি আমলের চূড়ান্ত অবসান হল ঠিকই, কিন্তু পুরোপুরি মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে লেগেছিল আরও তিন দশকেরও বেশি। বিদ্রোহী আফগানরা তো নানা জায়গায় ছিলই, আর কেন্দ্রীয় শাসনের অবসানে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে তখন বারো-ভুঁঞাদের অখণ্ড প্রতাপ। দফায় দফায় তাদের বাগে আনতেই কেটে গিয়েছিল অনেকটা সময়, শেষে মুঘল সুবাদার ইসলাম খান চিশতি ১৬১২-য় সারা বাংলা মুঘল অধিকারে আনেন। ধারাবাহিক অরাজকতার পর দেশে শান্তি ফিরল।
তবে বাংলার কিছু নিজস্ব উপকরণ ছিল। ইসলামি রীতির খিলান ও গম্বুজের সঙ্গে মিলে গেল বাংলার কুটিরের বাঁকানো চাল। পাল-সেন যুগের শিখর-মন্দিরের সঙ্গে এর কোনও মিল রইল না। কুটিরে খড়ের চালের যে বাঁক, তা বাঁশের মতো উপাদানের প্রয়োজনে। ইটের স্থাপত্যে তার দরকার ছিল না। কেউ কেউ বলেন, সুলতানি আমলের স্থাপত্যে বাঁকানো চালের ব্যবহার হয়েছে সহজে বর্ষার জল নিকাশের উদ্দেশ্যে।
আবার নিছক ভাল লাগা থেকেও তা হতে পারে। কারণ যা-ই হোক না কেন, এর ফল যে সুদূরপ্রসারী হয়েছিল তা আমরা একটু পরেই দেখব। মালদহ জেলার পাণ্ডুয়ায় পঞ্চদশ শতকের গোড়ায় তৈরি একলাখি সমাধিভবনে বাঁকানো চালের ব্যবহার প্রথম নজরে পড়ে, এর থেকে পুরনো কোনও ইসলামি স্থাপত্যে বাঁকানো চালের নজির নেই। পরে পুরো সুলতানি আমল জুড়ে বিভিন্ন ধরনের স্থাপত্যে এই রীতিই অনুসরণ করা হয়েছে।
বাংলার ইসলামি স্থাপত্যে পোড়ামাটির অলঙ্করণের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। পাণ্ডুয়া, গৌড় কিংবা অন্যান্য জায়গায় চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতকে মসজিদ, সমাধি ও বিভিন্ন স্থাপত্য নির্মাণ করতে গিয়ে সুলতানরা বাংলার পরম্পরাগত পোড়ামাটির অলঙ্করণকে অন্য মাত্রায় তুলে নিয়ে গেলেন— এও এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। ভারতের আর কোথাও ইসলামি স্থাপত্যে টেরাকোটা অলঙ্করণ নজরে পড়ে না। বাংলার স্থাপত্যে টেরাকোটা অলঙ্করণের খুব পুরনো একটা ঐতিহ্য ছিল যা বাংলাদেশের পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের পোড়ামাটির ফলকে দেখা যায়। তবে এ সব ফলক আকারে যেমন বড়, তেমনই মানুষ বা জীবজন্তুর রূপায়ণেও প্রাণোচ্ছল। তবে এই রকম টেরাকোটা অলঙ্করণের ধারা সম্ভবত বাংলায় ইসলাম আসার আগেই হারিয়ে গিয়েছিল। তাই সুলতানদের প্রয়োজনে তৈরি হল এক নতুন শিল্পী গোষ্ঠী, যে শিল্পীরা প্রাক্-ইসলামি যুগের মন্দির-নির্মাণ শৈলী থেকে অনেকটাই সরে এসে খিলান আর গম্বুজ দিয়ে ছাদ তৈরি শিখলেন, শিখলেন সূক্ষ্ম টেরাকোটা অলঙ্করণের রীতিনীতি। সে অলঙ্করণে প্রাণিজগতের কোনও রূপায়ণ নেই, শুধুই উদ্ভিজ্জ আর জ্যামিতিক নকশা।
মুঘল আমলের আগে পর্যন্ত এই স্থপতিরা মসজিদ বা সমাধি তৈরিতে একাগ্র মনে এই ভাবেই কাজ করে গিয়েছেন। তবে একেবারে গোড়ার দিকে (যেমন ১৩৮৪ খ্রিস্টাব্দে পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদ তৈরির সময়) যে হেতু স্থানীয় হিন্দু শিল্পীরাই ইসলামি স্থাপত্য নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছিলেন, তাই তাঁরা অন্তত অলঙ্করণের ক্ষেত্রে পরম্পরাগত অভিজ্ঞতার চিহ্ন রেখে গিয়েছেন। তারাপদ সাঁতরা দেখিয়েছেন, হিন্দু ভাস্কর্যে রূপায়িত ‘শিকলে ঝোলানো ঘণ্টা’র প্রতিকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত শিল্পীরা দড়িতে ঝোলানো প্রদীপদানি বা প্রস্ফুটিত পদ্মের নকশা খোদাই করেছেন। আদিনা মসজিদের মিহরাবের উপরের অংশে টেরাকোটা অলঙ্করণে এমন নিদর্শন অনেক।
ত্রয়োদশ থেকে ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলার মন্দির নির্মাণে প্রায় এক অন্ধকার সময়। প্রান্তিক অঞ্চলে কিছু মন্দির হয়তো তৈরি হয়েছিল, পুরুলিয়া জেলার তেলকুপি তার সব থেকে বড় নিদর্শন— যদিও পাঞ্চেত জলাধার তৈরির ফলে তার প্রায় সবই এখন বিলুপ্ত। এগুলি অবশ্য পাথরের মন্দির। এই পর্বে পোড়ামাটির অলঙ্করণ-সহ ইটের মন্দিরের সংখ্যা নগণ্য— তার মধ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বোধহয় উত্তরবঙ্গে রায়গঞ্জের কাছে বিন্দোলের ভৈরবী মন্দির। পাণ্ডুয়ার একলাখি সমাধিভবনের টেরাকোটা সজ্জার সঙ্গে এর মিল খুবই লক্ষণীয়। তার উপর এর চূড়া আবার গম্বুজাকৃতি। অনুমান করা যায়, মন্দির নির্মাণের এই পর্বে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলেছিল, বিন্দোল তারই অন্যতম উদাহরণ। তবে সাম্প্রতিক আমূল সংস্কারের পর তার খোলনলচে প্রায় বদলে গিয়েছে।
ষোড়শ শতকের বাংলায় শাসনক্ষমতা হস্তান্তরের সঙ্গে আস্তে আস্তে ফিরে এল সুস্থিতি। ভূস্বামীরা মুঘলদের বশ্যতা স্বীকার করায় নিজ নিজ অধিকারসীমায় অনেকটা স্বশাসনের অধিকার পেলেন। সীমান্তবর্তী বিষ্ণুপুর পেল বিপুল ক্ষমতা ও সম্মান। অন্য দিকে, চৈতন্য-প্রবর্তিত বৈষ্ণবধর্ম ইতিমধ্যেই প্রসারিত হয়েছে বাংলার নানা প্রান্তে। বৈষ্ণব ভাবান্দোলন এবং ক্ষমতাবান ভূস্বামীদের অক্লান্ত পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলার স্থাপত্যে শুরু হল এক নবজাগরণ। সতেরো থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত নবপর্যায়ের এই মন্দির নির্মাণের ধারা অক্ষুণ্ণ ছিল। কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চলে নয়, তা ছড়িয়ে পড়েছিল সারা বাংলাতেই।
এ দিকে নতুন করে মন্দির তৈরির প্রণোদনা উপস্থিত, কিন্তু কারিগর বা শিল্পী কোথায়? এত দিন যাঁরা ইসলামি স্থাপত্য তৈরি করছিলেন, আস্তে আস্তে নিশ্চয়ই তাঁরাই ঝুঁকলেন এই দিকে। অথবা বলা যায়, তাঁদেরই ডাক পড়ল নতুন কাজে। এক দিন তাঁরা শিখে নিয়েছিলেন খিলান আর গম্বুজ তৈরি, সঙ্গে টেরাকোটা অলঙ্করণের কারিকুরি। ছাদের কার্নিশ কী করে বাঁকাতে হয়, বুঝে নিয়েছিলেন তাও। এ বার আবার সবই কাজে লাগল। সেই খিলান আর গম্বুজ দিয়েই মন্দির তৈরি হল, চালে রইল যথেষ্ট বাঁক, কিন্তু বাইরে থেকে মসজিদের মতো দেখতে হলে তো চলবে না। তাই চূড়ার গম্বুজ ঢাকা পড়ল নানা ভাবে— কোথাও চারচালা বা আটচালায়। বাংলার স্থাপত্যে তৈরি হল নিজস্ব চরিত্র। চাহিদা এতটাই ছিল যে বাংলার নানা অঞ্চলে তৈরি হল স্থপতিদের ঘাঁটি, প্রয়োজন মতো তাঁরা বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে মন্দির তৈরি করতেন। স্থপতিদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর তৈরি মন্দিরে স্বাভাবিক ভাবেই নজরে পড়ে শৈলীর বিভিন্নতা, তবে এই বৈচিত্রের পিছনে পৃষ্ঠপোষকদের নানা রকম চাহিদার ভূমিকাও কম নয়।
Date Published: ০৬ ডিসেম্বর ২০২০ ০০:০১
Last modified: ০৬ ডিসেম্বর ২০২০ ০০:০১
Author: ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী
Entry Type: Opinion piece
Source: https://www.anandabazar.com/rabibashoriyo/renaissance-in-bengal-s-temple-architecture-during-sutani-period-1.1239165?fbclid=IwAR2zKSKmE6nqEgxDXILDz3ctoL48Pxj1zbZGYsJzj2hNAioSAQgy6cVrUSc#.X8ztjayZeh4.facebook